হাতে দামি ঘড়ি, চলাফেরায় আভিজাত্য, ফেসবুকে লাখের বেশি অনুসারী—বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে হিন্দি সিনেমার কোনো নায়ক। কিন্তু এই চকচকে চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আতঙ্ক মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন।
বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পুরো চট্টগ্রামজুড়ে এখন একের পর এক চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
সর্বশেষ নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিডিএন’ (ডিজিটাল ডট নেট)-এ দিনদুপুরে সিনেমার স্টাইলে সশস্ত্র হামলা ও ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় নতুন করে তীব্র আলোচনায় উঠে এসেছে এই সন্ত্রাসী।
ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন জানান, সম্প্রতি বিদেশি একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে তার কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ফোনে হুমকি দিয়ে ইমন বলেছিলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দেবেন।
না হলে এখন থেকে আমার ছেলেরা ব্যবসা করবে। আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।’
চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ঠিক দুই দিনের মাথায়, গত ১৩ জুলাই সোমবার দুপুরে ২০ থেকে ৩০ জন সশস্ত্র যুবক মুখে মাস্ক পরে ডিডিএন কার্যালয়ে তাণ্ডব চালায় এবং বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুট করে নেয়। সিসিটিভি ফুটেজে ছড়িয়ে পড়া এই হামলার পর এলাকাভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুরূপভাবে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ১০তলা ভবনে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় ইমনের অনুসারীরা। এরপর নতুন করে আরও ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়, যার ফলে ভবনটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
কে এই ডেভিড ইমন?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোবারক হোসেন ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে। তার বাবা মো. মুসা একজন সাধারণ কৃষক। লেখাপড়া তেমন না করা ইমন অল্প বয়সেই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে অপরাধজগতে তার তেমন নামডাক ছিল না। তবে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের দলে যোগ দিয়ে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে দ্রুত সাজ্জাদের নজরে আসেন তিনি। বর্তমানে সাজ্জাদ বাহিনীর অর্ধশতাধিক তরুণের সশস্ত্র গ্যাং পরিচালনা করছেন এই ইমন।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা এবং রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলায় এই চক্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। আগে দেশে সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন ‘ছোট সাজ্জাদ’ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বর্তমানে কারাগারে থাকায় ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান এলাকা ভাগ করে পুরো চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমন দুই বছরের ব্যবধানে অন্তত সাতটি হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুইজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা। এছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন (যার সমন্বয় ও মোটরসাইকেল ভাড়ার দায়িত্বে ছিলেন ইমন) এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা। এছাড়া নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষ সারোয়ার হোসেন বাবলার হত্যাকাণ্ডেও তার নাম এসেছে।
পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, ইমন অত্যন্ত অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ এবং তার কাছে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্রের অ্যাক্সেস রয়েছে।
ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গত এক মাসেই প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করেছে ইমন বাহিনী। অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসির মোড় ও পাঁচলাইশ এলাকার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কের মুখে নীরবে চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিডিএনে হামলার খবর পেয়েই ‘নেট প্লাস’ নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের মালিককেও ফোন করে হুমকি দেয় ডেভিড ইমন।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (আইএসপিএবি)-এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় নেতারা।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাত ৩টার দিকে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকা থেকে সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চেকপোস্ট বসিয়ে ধুমধুমপুর এলাকা থেকে ডেভিডকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে। তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

