গাজার আল-বুরেইজ শরণার্থীশিবির। একটি খোলা জানালার পাশে ছোট্ট একটি কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল ১৫ মাস বয়সী জায়েদ নোফাল। গাজার প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে তার গায়ে কোনো কম্বল ছিল না। রাত ৩টার দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় ছোট্ট জায়েদের শরীর। সে সময় বাড়ি থেকে কয়েক মিটার দূরে ৩৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মা ফাতিমা নোফাল হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রক্ত ও ধুলোয় ঢেকে থাকা ফাতিমার চারপাশে প্রতিবেশীরা চিৎকার করছিলেন। এর মধ্যেই তিনি এমন এক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হলেন, যা এর আগেও একবার তাকে সহ্য করতে হয়েছিল। জায়েদ ছিলেন ইসরায়েলি হামলায় নিহত তার চতুর্থ সন্তান। এর আগে ২০২৩ সালে তার আরও তিন ছেলে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছিল। এক প্রতিবেদনে গত ২০ জুলাইয়ের এই হৃদয়বিদারক ঘটনার খবর তুলে ধরেছে মিডল ইস্ট আই।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার পরপরই প্রতিবেশীরা ওই বাড়িটির দিকে ছুটে যান। বাড়িটি আগেও আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়ার পর সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। মিডল ইস্ট আইকে ফাতিমা বলেন, ‘যা ঘটেছে, আমি এখনো তা মেনে নিতে পারিনি। আমি গভীর শোক ও ধাক্কার মধ্যে আছি। আমার শুধু মনে আছে, হামলার কয়েক মিনিট আগে আমার ঘুম ভেঙেছিল। প্রচণ্ড গরমের কারণে আমি অন্য একটি জায়গায় চলে যাই, আমার ছোট্ট জায়েদকে জানালার পাশে রেখে আসি যাতে হালকা বাতাসে সে ঘুমাতে পারে।’
হামলায় আহত হলেও ফাতিমা সেখান থেকে চলে যেতে রাজি হননি। তিনি প্রতিবেশীদের তার ছেলেকে খুঁজে বের করার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘ঘরটি ধ্বংসস্তূপে ভরে গিয়েছিল। জায়েদকে খুঁজে বের করতে প্রতিবেশীরা ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু করে।’ শেষ পর্যন্ত স্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় তাকে এবং একটি পাতলা কম্বলে জড়িয়ে হাসপাতালেও নেয়া হয়।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত জায়েদ আর ফেরেনি।
২০২৩ সালে নিহত তিন ছেলে
জায়েদের মৃত্যু ফাতিমার মনে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি আবার ফিরিয়ে এনেছে। ওই দিন ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার তিন ছেলে নিহত হয়েছিল। শুধু ফাতিমা ও তার দুই মেয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর দিকে ফাতিমা ও তার পরিবার আল-বুরেইজ শরণার্থীশিবির ছেড়ে উপকূলীয় শহর আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, সেখানে তারা তুলনামূলক নিরাপদ থাকবেন।
ফাতিমা বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছিলাম এবং পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম সীমান্তের কাছে থাকার চেয়ে সেখানে নিরাপদ থাকব। কিন্তু আমরা কখনো কল্পনাও করিনি, নিরাপত্তার জন্য যে জায়গায় গিয়েছিলাম, সেখানেই আমার তিন ছেলেকে এবং আমার স্বামীর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে নিহত হতে দেখব।’
ওই হামলায় নিহত হয় তার ১৬ বছর বয়সী বড় ছেলে আমিন, ১১ বছর বয়সী হামজা এবং নবজাতক ছেলে আহমেদ। আহমেদের বয়স তখন মাত্র ২২ দিন ছিল। ফাতিমা ও তার দুই মেয়েও হামলায় আহত হন। আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বারবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাস্তুচ্যুত হতে হয় তাদের।
‘ছোট্ট এক অলৌকিক ঘটনা’
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাজার প্রায় সব মানুষের মতো ফাতিমাকেও মাসের পর মাস বাস্তুচ্যুতি, স্বজন হারানো এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তিন ছেলে হারানোর ১০ মাস পর তার জীবনে আশার একটি মুহূর্ত আসে। তিনি জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। পরে যখন জানতে পারেন তার গর্ভে ছেলে সন্তান, তখন তার আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল জায়েদের জন্ম হয়। হারিয়ে যাওয়া ছেলে সন্তানদের শূন্যতা এই শিশুটি পূরণ করবে বলে মনে করেছিলেন ফাতিমা। তিনি স্মরণ করে বলেন, ‘যুদ্ধের সময় আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল জায়েদের জন্ম। তার আগমনে পুরো পরিবারে অপরিসীম আনন্দ নেমে এসেছিল। দীর্ঘ কয়েক মাস ও রাতের যন্ত্রণা এবং কান্নার পর আমাদের জীবন আলোকিত করতে আসা ছোট্ট এক অলৌকিক ঘটনা হিসেবে সবাই তাকে স্বাগত জানিয়েছিল।’
স্বজনেরা জায়েদের নাম তার নিহত কোনো এক ভাইয়ের নামে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফাতিমা রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম তার নিজের একটি নাম এবং নিজের একটি ভবিষ্যৎ থাকুক।’ সময়ের সঙ্গে জায়েদ হয়ে ওঠে পরিবারের ‘আনন্দ’। বিশেষ করে তার দুই বোনের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফাতিমা বলেন, ‘টিকা বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে তাকে ক্লিনিকে নিয়ে গেলে তার বোনেরা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করত। কয়েক ঘণ্টার জন্যও তারা তার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারত না।’
ফাতিমা যখন মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন তার পায়ের পোড়া ক্ষত থেকে সেরে উঠছিলেন। তার বড় মেয়ে বারাও সামান্য আহত হয়েছে। আর ছোট মেয়ে লিনা মাথায় আঘাত পেয়েছে। ফাতিমা বলেন, ‘লিনা এখনও হাসপাতালে। আমি তাকে দেখতে গেলে প্রথমেই সে জায়েদের কথা জানতে চায়। সে নিজেও আহত থাকায় আমি তাকে সত্যিটা বলতে পারিনি।’
জায়েদ তার শৈশব কখনোই পায়নি বলেও জানান তিনি। বলেন, ‘যেদিন তাকে হত্যা করা হয়, সেদিন বিকেলে সে অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং বাইরে যেতে চাচ্ছিল। আমি তার বোনদের বলেছিলাম, আমি কতটা চাই তাকে বাইরে নিয়ে যেতে। কিন্তু শিশুদের খেলার মতো কোনো জায়গাই আর অবশিষ্ট নেই। সে পুরো জীবন ঘরের ভেতরেই কাটিয়েছে। তার চাচাতো-মামাতো ভাইদেরও ইসরায়েলি বিমান হামলায় হত্যা করা হয়েছে। ফলে খেলার মতোও তার আর কেউ ছিল না।’
শিশু সন্তান জায়েদকে হারিয়ে আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে এই মা আরও বলেন, ‘আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, আর আমি জানি না কে সেই আগুন নেভাবে।’
ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃত শিশু নিধন
গাজায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ থামাতে গত বছর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর প্রায় ১০ মাসে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সামগ্রিকভাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। এই প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশুরাও। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জুন মাসে জানিয়েছিল, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে গাজায় নিহত হয়েছে প্রায় ২৬০ শিশু। ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধবিরতির নিষ্ঠুর ও প্রাণঘাতী বিভ্রম’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, গড়ে প্রতিদিন একজন শিশু নিহত হচ্ছে উপত্যকায়।
