নেত্রকোণা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের ভাইরাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে স্কুলছাত্রীকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। রোববার (২ আগস্ট) রাতে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নন্দুরা বাজারে স্থানীয় বিএনপির কার্যালয়ে সালিশে বসেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতিসহ স্থানীয় নেতাকর্মী ও গণ্যমান্যরা। সেখানে রিপন মিয়াকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, রিপন মিয়া সালিশে কয়েকজনের পায়ে ধরে ক্ষমা চাচ্ছে এবং সে তার অপরাধ স্বীকার করেছে বলেও জানায় স্থানীয়রা।
জানা গেছে, নেত্রকোণা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের রিপন মিয়া পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। ২০১৬ সালে ফেসবুকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে যাত্রা করেন রিপন। তিনি পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। কিছুদিন আগে রিপন মিয়া পাশের নন্দুরা গ্রামে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ছিন্নমূল পরিবারের সন্তান এবং সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।পরিবারটির বসতি রিপনের বাড়ির পাশে সরকারি রাস্তার ধারের জমিতে। বিভিন্ন সময় রিপনের কাছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াশিক্ষার্থী ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের যাতায়াত ছিল। কিশোরীর বাড়িতেও রিপনের যাতায়াত ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, রিপন প্রায়ই ওই কিশোরীকে উত্যক্ত করতেন। গত দুই দিন আগে বাড়ির উঠোনে রান্না করার সময় কিশোরীকে কৌশলে বাড়ির পিছনে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন রিপন। পরে স্থানীয় দুজন ঘটনাটি দেখে ফেললে তাদের ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করারও অভিযোগ ওঠে রিপনের বিরুদ্ধে। পরে বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয়রা বিষয়টি মীমাংসার জন্য দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের নন্দুরা বাজারে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির কার্যালয়ে সালিশ বসে। সালিশে রিপন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নেতা আবদুল হাই মুন্সি, আতাউর রহমান, স্থানীয় জামায়াত নেতা জয়নাল আবেদীন, দৌলত মিয়াসহ এলাকাবাসী রোববার রাতে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির কার্যালয়ে সালিশ বসে। সালিশে অভিযুক্ত রিপন মিয়া নিজের দোষ স্বীকার করেন। পরে তাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা ৫ দিনের মধ্যে দেয়ার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয় বলেও জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া সালিশের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রিপন মিয়া সবার সামনে বলছেন আমার দোষ থাকলেও আছে, না থাকলেও আমি সবার সিদ্ধান্ত মেনে নেব।
নাম না প্রকাশের শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, ধর্ষণের মতো ঘটনা গ্রাম্য সালিশে নিষ্পত্তি এটা ঠিক হয়নি। এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। ভবিষ্যতে ধর্ষণের মতো এমন ঘটনা কেউ না ঘটায়। সালিশে উপস্থিত ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
রিপন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসে আছেন, ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তার স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছে, দরবারে এক পক্ষ ছিল, রিপনের পক্ষে রিপন ছাড়া তার পরিবারের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বলেন, আমরা গরীব মানুষ স্বামী- স্ত্রী মিলে দক্ষিণ বিশিউড়া বাজারে একটি চায়ের দোকান চালাই। যে কারণে আমার কিশোরী মেয়ে বাড়িতে একা থাকে। এই সুযোগে পার্শ্ববর্তী বাড়ির রিপন মিয়া (কনটেইন ক্রিয়েটর রিপন ভিডিও) আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছে। আমরা গরীব মানুষ হওয়ায় এলাকার মাতব্বররা বিচার করে। তবে আমি প্রশাসনের সহযোগিতার মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত রিপন মিয়া আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অপরদিকে সালিশের পর ভিকটিমকেও এলাকা থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
নেত্রকোণা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয়েছে শুনেছি। ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মত ঘটনায় কোনো ধরনের সালিশ দরবারের মাধ্যমে মীমাংসা করার সুযোগ নেই। এ ঘটনাটি যারা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করতে চেয়েছিল তা প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এ ঘটনায় এখনও থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ হয়নি।
