জামায়াত এমপি নজরুলের বিয়ের কাবিননামা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন কাজী

সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রবীণ সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একাধিক আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ঢাকার মগবাজার এলাকার একটি শয়ন কক্ষ থেকে সিসিটিভি ও মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ভিডিওগুলোতে এক তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায় তাকে। এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সামাজিক ও গণমাধ্যমগুলোতে বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করা হয়। গত সোমবার রাতে ভাইরাল হওয়া প্রথম ভিডিওকে দলীয় সমর্থকদের অনেকে এআই দিয়ে তৈরি করা দাবি করলেও পরে এমপি নিজেই তার ব্যাখ্যা দেন। তিনি আলোচিত মরিয়ম খাতুন নামে তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন।

তবে জামায়াত এমপির বিয়ে ও ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়া কাবিননামা নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ১৭ জুন বিয়ে করেছেন বলে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করলেও কোথায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে তা কাবিননামা নিবন্ধনকারী কাজী জানেন না। কাজী জানিয়েছেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে গত পরশু (সোমবার) দিবাগত রাতে। তারপরই ঢাকা থেকে ফোনে দেওয়া তথ্য দিয়ে তিনি কাবিননামা প্রস্তুত করেছেন।

কাবিননামার তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানার ১২ নং গাবুরা ইউনিয়নের কাজী মাওলানা বি এ এম বাকী বিল্লাহর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টায় আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মোবাইল ফোনে (০১৯১১৩৩২৬…) স্বীকার করেন বিয়ে কবে, কোথায় হয়েছে তিনি জানেন না। তাকে সোমবার রাতে জানানো হয়েছে, ঢাকায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। নিবন্ধন তাকে করতে হবে।

ভাইরাল ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠলে আলাদা দুটি ভিডিওতে তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং তার পিতা মাসুম বিল্লাহ একই ধরনের বক্তব্য দেন। সেখানে বলা হয়েছে, পারিবারিকভাবেই তিন লাখ টাকা দেনমোহরে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এটা নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে জামায়াতের প্রবীণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এই এমপির এ ধরনের ভিডিও ভাইরালের ঘটনায় দলটির অভ্যন্তরে চাপা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আরো খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ।

এদিকে গাজী নজরুলের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল এবং তা নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগের এক পর্যায়ে মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে একটি রুমে গাজী নজরুল ইসলাম এমপিকে তরুণীসহ অবরু্দ্ধ করে কয়েকজন ব্যক্তি। ওই ভিডিওতে এমপিকে উদ্দেশ করে লোকজনকে বলতে শোনা যায়Ñ জামায়াত হয়ে এই কাজ কীভাবে করলেন? কদিন এনেছেন? অন্যায় করেছেন কিনাÑইত্যাদি। এ সময় গাজী নজরুল মাথা নেড়ে অন্যায় স্বীকার করে বলেন, ‘বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম’।

এ সময় মেয়েটির নাম জিজ্ঞাসা করা হলে অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে নাম মাহি বলে জানায়। তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা ভিডিও ডিলিট করে দেন, সবকিছু বলছি। বলেও যা, না বলেও তা। আপনারা এটা নিয়েই তো ঝামেলা করবেন।’

এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ের একটি কাবিননামাও ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, মেয়েটির জন্ম ২০০৮ সালের ২২ মে। তবে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানটি দ্য ডিসেন্ট মরিয়মের একটি বায়োডাটা সংগ্রহ করেছে, যেটিতে গাজী নজরুল ইসলাম এমপির গত ২২ জুন স্বাক্ষর করা সুপারিশ রয়েছে। বায়োডাটাটিতে এমপির স্বাক্ষরের উপরে সবুজ কালিতে হাতে লেখা রয়েছে, ‘জোর সুপারিশ করছি।’ বায়োডাটাটিতে মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা রয়েছে।

১৭ জুন বিয়ে করে থাকলে ২২ জুন এমপি স্বাক্ষরিত মরিয়মের বায়োডাটাতে ‘অবিবাহিত’ লেখা হয়েছে কেনÑ এ বিষয়ে জানতে পরবর্তীতে গাজী নজরুলকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি বলে দ্য ডিসেন্ট তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

কাজী যা বললেন

কাজী বাকীবিল্লাহ আমার দেশ-এর প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমাকে সোমবার রাতে ফোনে সংসদ সদস্য ও মেয়েটির বিয়ের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিয়ের নিবন্ধন ১৭ তারিখ দেখানো হয়েছে। তার ভাষ্য, কনের বাবা সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সম্মতি দিয়েছেন এবং কনে ও অভিভাবক মঙ্গলবার সকালে এসে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন, বিয়ের তারিখ ১৭ তারিখ নির্ধারণ করে দিতে তাকে ফোনে জানানো হয়েছিল। মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টরা স্বাক্ষর করেন।

কাবিননামায় কনের নাম ও জন্ম তারিখের অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য তাকে ফোনে জানানো হয়েছিল। জন্ম তারিখও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী লিখেছেন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, কনের বয়স ১৮ বছর ৩ মাস ছিল।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ১৭ তারিখকে বিয়ের তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করতে তাকে ঢাকা থেকে ফোনে বলা হয়েছিল, আর স্বাক্ষর পরে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি একাধিকবার বক্তব্যে ভিন্নতা দেখান। শেষদিকে তিনি বলেন, ‘আচ্ছা ভাই, আমি যাতে বিপদে পড়ে না যাই, আমাদের বিপদে ফেলেছেন। ঠিক আছে, ঠিক আছে’ বলে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন।