কারাবন্দী অবস্থায় পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মৃত্যু হয়েছে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাকিস্তানে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। যদিও পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, সাংবাদিক ওয়াজাহাত সাঈদ খান, যিনি শুরুতে ইমরান খানের মৃত্যুর খবর দিয়েছিলেন, পরে স্পষ্ট করেন যে- তাঁর সূত্রগুলো আসলে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এই ঘটনা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দেয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া, তাঁর কারাবাসকে ঘিরে যে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাংবাদিক শুরুতে দাবি করেছিলেন ইমরান খান মারা গিয়েছেন
ওয়াজাহাত সাঈদ খান ১১ আগস্ট ‘ইজ খান স্টিল উইথ আস’ (খান কি এখনো আমাদের মাঝে আছেন) এবং ‘হোয়াট হ্যাপেনস আফটার খান’ (খানের পর কী হবে) শিরোনামে দুই পর্বের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। প্রাথমিক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছিলেন যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের একটি সূত্র তাঁকে জানিয়েছে, ইমরান খান হেফাজতে থাকাকালীন মারা গিয়েছেন।
এই দাবি দ্রুত জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়। তবে পরবর্তীতে ওই সাংবাদিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে জানান যে, তাঁর সূত্রগুলো দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। পরবর্তী একটি ভিডিওতে ওয়াজাহাত বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তা খানের অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কোনও প্রমাণ দেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, “বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। তাঁরা নিশ্চিত করেননি যে ইমরান খান মারা গিয়েছেন।”
সাংবাদিকের সূত্রগুলো আসলে কী বলেছিল?
ওয়াজাহাতের মতে, সামরিক কর্মকর্তারা “গভীর ও পঙ্গু করে দেওয়ার মতো ভয়ের” কথা জানিয়েছিলেন যে, “সবচেয়ে খারাপ কিছু হয়তো ঘটে গিয়েছে বা ঘটতে পারে”। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাতে তারা ইমরান খানের বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে, সরাসরি তাঁর মৃত্যুর ঘোষণা করে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আজ আমরা কী অর্জন করলাম?” তিনি আরও যোগ করেন, “আমি কর্তৃপক্ষকে তাঁর বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছি।”
এই সাফ কথার ফলে মূল দাবির প্রকৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়। খানের মৃত্যুকে নিশ্চিত হিসেবে তুলে ধরার পরিবর্তে, সাংবাদিক স্বীকার করেন যে তাঁর কাছে থাকা তথ্য কেবল কিছু সামরিক কর্মকর্তার উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু মৃত্যুর কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ দেয় না।
খানের কারাবাস ঘিরে অস্বাভাবিক গোপনীয়তার দাবি
ওয়াজাহাত জানান, তাঁর প্রতিবেদনটি সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স এবং সি৪আই ডিরেক্টরেটের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তা এবং একজন জুনিয়র কমিশনড অফিসারের সঙ্গে আলোচনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। তিনি জানান যে, এই ব্যক্তিরা রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন।
তাঁর মতে, প্রাপ্ত তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে খানের কারাবাসকে ঘিরে অস্বাভাবিক রকমের গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছিল। তিনি অভিযোগ করেন যে, সেনাবাহিনী এ বিষয়ে “অস্বাভাবিক, ভীতিকর ও হিমশীতল নীরবতা” পালন করছিল এবং কোনও তথ্য প্রকাশ করছিল না। তিনি আরও দাবি করেন যে, সরাসরি সেনাপ্রধানের কাছে রিপোর্ট করা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি ছোট দল খানের কারাবাস-সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারকি করছিল।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ‘ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস ডিরেক্টরেট’ (আইএসপিআর) এসব প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করার পর বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। সেনাবাহিনী এই খবরগুলোকে মিথ্যা বলে অভিহিত করে এবং কার্যত ইমরান খানের কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করে। কারাবন্দী পিটিআই নেতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরুর প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই অস্বীকৃতি জানানো হয়।
ওয়াজাহাত সেনাবাহিনীর এই প্রতিক্রিয়াকে স্বাগত জানান এবং যুক্তি দেন যে, সেনাবাহিনী প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে, এটিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “আইএসপিআর যে সাড়া দিয়েছে তাতে আমি খুশি, খবরটি ভুয়ো হোক বা অন্য কিছু, কারণ এর অর্থ হল ইমরান বেঁচে আছেন।”
ইমরান খান কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে?
৭২ বছর বয়সী ইমরান খান ২০১৮ সাল থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তাঁর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০২৩ সালের ৯ মে গ্রেপ্তারের পর তাঁর আইনি জটিলতা তীব্র আকার ধারণ করে এবং এর জেরে তাঁর সমর্থকরা ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট তাঁকে ফের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তখন থেকেই তিনি কারাগারে রয়েছেন। সরকারি গোপনীয়তা রক্ষা আইন লঙ্ঘন এবং বুশরা বিবি খানের সঙ্গে বিয়ে সংক্রান্ত মামলায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে খান খালাস পান। তবে অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তিনি কারাগারেই থেকে যান। বর্তমানে তিনি ‘আল-কাদির ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। একই মামলায় বুশরা বিবিকেও সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

