মাদরাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বাংলা খবর।
ঘটনার সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় সংসদ সদস্য গোলাম রসুল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন, ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং বলেন তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চেয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সংসদ সদস্যের বাড়ির সামনে অবস্থিত ‘আল মাদরাসাতুশ শারইয়াহ’ ও মসজিদের যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবারের সঙ্গে মাদরাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের বিরোধ চলছিল। গতকাল সোমবার সংসদ সদস্যের মেয়ে অনন্যা মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখালে বিরোধের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে পুলিশের মধ্যস্থতায় সাময়িকভাবে মীমাংসা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনন্যা মাদরাসাটি বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিলে এলাকাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে।
ডা. পদবি ব্যবহার করায় জামায়াতের এমপি প্রার্থীকে শোকজ
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ও তার মেয়ে অনন্যা পুনরায় মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অনন্যা রেক্সোনা নামের স্থানীয় এক নারীর মাথা ফাটিয়ে দেন এবং নাসির উদ্দিন নামে অপর এক অভিভাবকের ওপর চড়াও হন। এতে এলাকাবাসী চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে সংসদ সদস্য ও তার মেয়ে নিজেদের বাসভবনে গিয়ে মূল ফটক বন্ধ করে দেন। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বাসভবনে হামলা চালিয়ে গেট, গ্লাস ও গাছপালা ভাঙচুর করে।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, ‘মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরোধের সূত্র ধরে এলাকাবাসীর সঙ্গে সংসদ সদস্যের পরিবারের ঝামেলা হয়। এরপর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিচারের দাবিতে ওই বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে।’সংবাদ শিরোনাম
অবরুদ্ধ অবস্থায় সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ফেসবুক লাইভে এসে তার পরিবারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, আমি গোলাম রসুল। এমপি ৮৮৪ আমার বাসা নীলগঞ্জ নড়াইল রোড প্রফেসরপাড়া। আমার বাসার সামনে একটি কওমি মাদরাসা আছে। এই মাদরাসা তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠিত। মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমি নিজেও সহযোগিতা করেছি। এলাকার শিশুরা যদি মাদরাসায় পড়ে তারা দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করবে। এখন প্রায় মাদরাসায় ২৫০ থেকে ৩০০ ছাত্র আছে। কিন্তু জায়গা অনেক কম। মাদরাসা ও বাড়ির মাঝে ৯ ফিট রাস্তা আছে। এই রাস্তায় অধিকাংশ সময় অভিভাবকরা থাকে শিশুরা থাকে। সোমবার সন্ধ্যার দিকে আমার মেয়ে এটা নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার পর বাগবিতণ্ডা হয় এবং আমার মেয়েকে তারা মারধর করে। সেখানে আমার স্ত্রীও নিগৃহীত হয়।
তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে মাদরাসার হুজুরকে আমি জিজ্ঞেস করলাম। মাদরাসাটা প্রতিষ্ঠা থেকে আমি যেহেতু সহযোগিতা করেছি। এই এলাকার আরও প্রায় ২০টা পরিবার আছে, তারা এটাকে এভাবে নিতে পারে না, যেহেতু রাস্তাটা সবসময় ব্লক থাকে এবং রাস্তাটা তো আমাদের কেনা জমি, কাজেই রাস্তাটা সবসময় সচল রাখা দরকার, যাতে কোনো ভিড় না হয়। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী যারা আসবে তাদেরকে ভিতরে রাখার ব্যবস্থা করেন। এই কথা বলার পরই উপস্থিত নারী অভিভাবকরা চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরে এবং আমাকে নানাভাবে নাজেহাল করতে থাকে। আমি তাদেরকে বললাম যে বিষয়টা আমি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি, আপনারা তো আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন না, এরপর আমার মেয়ে সেখানে যায়, তারা আমার মেয়েকে মারধর করে।
নিজের মেয়ে অনন্যাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ দাবি করে তিনি জানান, ‘আমি তখন বললাম যে আমার মেয়েটা অসুস্থ। ২০২০ সাল থেকে প্যানক্রিয়া রোগী আক্রান্ত সাইকিয়াট্রিক হওয়ার কারণে ঢাকা, খুলনা, যশোর এবং ইন্ডিয়াতে চিকিৎসক দেখিয়েছি। প্রতি মাসে এক-দুইবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো লাগে পেটে ব্যথার কারণে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বার সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং তিন-চার বার তাকে আইসিতে রাখতে হয়েছে। আমি বললাম আমার মেয়েটাকে মারবেন না। তারপরও আমার মেয়েকে তারা মারতে থাকে। এক পর্যায়ে আমার স্ত্রী যায় তাকেও তারা মারধর করে। আমি এক পর্যায়ে সেখান থেকে আমার মেয়ে এবং স্ত্রীকে বাসার ভিতরে নিয়ে আসি। এরপর এলাকার উশৃঙ্খল যুবকদের দিয়ে আমার বাসায় ভাঙচুর করেছে। আমার গেট ভাঙচুর করেছে। বাসার বিভিন্ন গ্লাস, গাছ ভাঙচুর করে। অকথ্য ভাষায় তারা গালিগালাজ করে।
তিনি বলেন, আমি সহনশীল পরিবেশ বজায় রাখতে চাই। সবার সঙ্গে সহযোগিতা করে বসবাস করতে চাই। আমার কারো সঙ্গে কোনো ক্ষোভ নেই। কারো সঙ্গে আমার কোনো রাগ নেই। আমি দীর্ঘ ২০১৬ সাল থেকে এখানে বাড়ি করে বসবাস করছি। এলাকার কোনো মানুষ বলতে পারবে না আমি কারো ক্ষতি করেছি। আমি এলাকার মানুষকে সবসময় সহযোগিতা করি। কাজেই আমি এই ঘটনায় অত্যন্ত দুঃখিত এবং মর্মাহত। আমি আবারো জনগণকে বলছি যে আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী।

