বিয়ে, ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় কদর বাড়ে সুগন্ধি চালের। অনেকের কাছেই এটি আতপ নামে পরিচিত। কিন্তু এবার উৎসব পার্বণ ছাড়াই বেড়েছে সুগন্ধি চালের দাম। তাও আবার চার কিংবা পাঁচ টাকা নয়। নওগাঁর বাজারে এক কেজি আতপ চালে ৮০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। শুধু তাই নয়; সুগন্ধির পাশাপাশি বেড়েছে কাটারীসহ সব ধরনের সরু চালের দামও। দেশের বৃহত্তর চালের মোকাম নওগাঁয় ঠিক এমনই টালমাটাল চালের বাজার। চালের এমন অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
ক্রেতা আর কিছু খুচরা ব্যবসায়ী বলছেন, বড় কিছু মিল আর কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর মজুদ সিন্ডিকেটের কারণেই বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, সরকারিভাবে রপ্তানি আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণেই ঊর্ধ্বমুখী চালের দাম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের কথা বললেও বাস্তবে দেখা মিলেনি কারো।
নওগাঁ শহরের সবচেয়ে বড় খুচরা চালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সকল প্রকার সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। শোর্টার ও নন শোর্টারসহ সব ধরনের কাটারির দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণ কালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। তিন সপ্তাহ আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকা কেজিতে। কিন্তু প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৮০ টাকা। চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ভোক্তাদের মাঝে। বাজারে চাল কিনতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
নওগাঁ সদর উপজেলার ডাক্তারের মোড় এলাকা থেকে পৌর চাল বাজারে আতপ চাল কিনতে এসেছিলেন মোসলেম উদ্দিন। তিনি বলেন, গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৩ কেজি আতপ কিনতে এসেছিলেন তারা কয়েকজন। কিন্তু বাজারে এসে শুনেন সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সবমিলিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
উপজেলার বালুভরা গ্রামের কৃষক আল ফারুকের সঙ্গে কথা হয় নওগাঁর খুচরা বাজারে। ৫ কেজি ভাতের চাল কিনতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েন বাবুল। বলেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ওই বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী রহমত আলী চালের ব্যবসা করেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। তিনি জানান, তার ব্যবসার জীবনে এতটা দাম বৃদ্ধি কখনও দেখেননি তিনি। বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বৃদ্ধির পিছনে যৌক্তিক কোনো কারণ আছে বলে মনে করেন না এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, প্রতিদিনই ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে তাদের। আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার অভিযোগ করেন, কিছু বড় মিলার ও কর্পোরেট ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই চাল কিনে মজুদ করেছেন। তারাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
তবে অবৈধ মজুদের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন নওগাঁর মিল মালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের দাবি যাদের কাছে মজুদ আছে তারা সরকারের মজুদ নীতি মেনেই মজুদ করেছে।
মফিক উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম জানান, সরকার কয়েক মাস ধরেই আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়ে রেখেছেন। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ চাল রপ্তানি হচ্ছে। যার কারণেই আতপের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। আর আতপের যোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালে। মানুষ আতপের চাহিদার অনেকটাই কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল দিয়ে মিটাচ্ছেন। যার কারণেই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি।
নওগাঁ চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, কোনো মিলারই অবৈধ মজুদ করে না। বহু বছর লোকসানের পর এবারই কিছুটা লাভের মুখ দেখছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি চালের দাম বাড়ায় কৃষকরা ধানের দাম বেশি পাচ্ছেন। অর্থাৎ ধান বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে হাটগুলোতে প্রতি মন কাটারি ১৮০০ আর আতপ কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়।
এদিকে, চাল বাজারে এমন অস্থির পরিস্থিতিতেও দেখা নেই খাদ্য বিভাগ কিংবা প্রশাসনের। যদিও প্রতিনিয়তই বাজার মনিটরিং এর দাবি করেছেন নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার। তিনি বলেন, মূলত রপ্তানির কারণেই দাম বেড়েছে কিছুটা।
তিনি আরও বলেন, নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে সাড়ে ৪০০ রাইস মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়তই মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুদ অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

