ডায়াবেটিস মানেই শুধু রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া নয়। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো লিভার। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন প্রতিরোধের সমস্যা থাকলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, লিভারে সমস্যা তৈরি হলেও শুরুতে অনেকের শরীরে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অজান্তেই লিভারের ক্ষতি বাড়তে থাকে।
কীভাবে লিভারে চর্বি জমে?
ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীর অতিরিক্ত গ্লুকোজকে চর্বিতে রূপান্তর করতে পারে। সেই চর্বি ধীরে ধীরে লিভারে জমতে শুরু করে। একপর্যায়ে দেখা দিতে পারে ফ্যাটি লিভার।
দীর্ঘদিন এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে লিভারে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিস তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে তা সিরোসিসের মতো জটিল অবস্থায়ও গড়াতে পারে।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করবেন না
লিভারের সমস্যা শুরু হলে সবসময় স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কয়েকটি অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
যেমন—
১. সবসময় ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা
২. পেটের ওপরের ডান দিকে ভারী ভাব বা হালকা অস্বস্তি
৩. পেট ফাঁপা
৪. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
এসব লক্ষণকে অনেকেই সাধারণ ক্লান্তি, মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন কিংবা হজমের সমস্যার কারণে হচ্ছে বলে মনে করেন। ফলে মূল সমস্যাটি শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।
উপসর্গের আগেই ধরা পড়তে পারে সমস্যা
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগেই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব। এজন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভার ফাংশন পরীক্ষা করলে লিভারের কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়তে পারে। প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমেও লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমেছে কি না, তা জানা যায়।
তাই নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলেও ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অবহেলা করা উচিত নয়।
ডায়াবেটিস থাকলে লিভার সুস্থ রাখবেন যেভাবে
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন: অতিরিক্ত ওজন ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ড ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীরের ইনসুলিন ব্যবহারের সক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
খাবারে সতর্ক হোন: অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি ও পরিশোধিত শর্করা কমিয়ে সুষম খাবার, শাকসবজি ও পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখার চেষ্টা করুন।
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: অ্যালকোহল লিভারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে এবং লিভারের বিদ্যমান সমস্যা আরও খারাপ করতে পারে।
নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা খাদ্য-পরিপূরক গ্রহণ করা ঠিক নয়। বিশেষ করে লিভারের সমস্যা থাকলে যেকোনো ওষুধ গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিয়মিত পরীক্ষা করুন: ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিভার ফাংশন পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
ডায়াবেটিস থাকলেই লিভার নষ্ট হয়ে যাবে—এমন নয়। তবে দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস লিভারে চর্বি জমা এবং পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ওজন স্বাভাবিক রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও জরুরি। শরীরে অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
