সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বাংলাদেশ এখন নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে নতুন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হয়েছে, যার ফলে পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান কে হচ্ছেন তা অনেকটাই নিশ্চিত। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই বেছে নিয়েছে তার দল। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে সচিবালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে এলডিপি প্রেসিডেন্ট অলি আহমদ এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
জাতীয় সংসদে আসন গ্রহণকারী সংসদ সদস্যদের আনুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমেই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময় পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে মোট ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ২২টি ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্থায়ী, অস্থায়ী এবং ভারপ্রাপ্ত—এই তিন রূপে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রপতির একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:
শেখ মুজিবুর রহমান (প্রথম ও পঞ্চম রাষ্ট্রপতি)
মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে, যা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল ছিল। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি।
দ্বিতীয় মেয়াদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম (অস্থায়ী)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশের প্রথম ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির’ দায়িত্ব সাহসিকতার সঙ্গে পালন করেন।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ফিরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তিনি। তবে তৎকালীন রাজনীতির নানাবিধ জটিলতা ও অস্বস্তিকর প্রেক্ষাপট তৈরিতে ক্ষুব্ধ হয়ে মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনবিদ।
মুহম্মদুল্লাহ (ভারপ্রাপ্ত ও নিয়মিত)
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর তখনকার স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত স্বপদে ছিলেন মুহম্মদুল্লাহ। মূলত বঙ্গবন্ধুর একদলীয় শাসন চালুর মাধ্যমে তার মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক। কিন্তু একই বছরের ৩ নভেম্বর সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে ৬ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৮১ দিন।
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন দেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পদত্যাগ করেন তিনি।
জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সেনাপ্রধান ও সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করে নির্বাচনে বিজয়ী হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার (অস্থায়ী ও নিয়মিত)
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান আবদুস সাত্তার। পরে ১৯৮১ সালের ২০ নভেম্বর নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক রাষ্ট্রপতি, যাকে সেনা অভ্যুত্থানে হটানো হয়।
বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সান উদ্দীন চৌধুরী
আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আহ্সান উদ্দীন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি বানায় সামরিক শাসক এরশাদ। মাত্র ৯ মাস পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ তাকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ার দখল করেন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির পদে বসেন স্বৈরশাসক এরশাদ। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও ৯০-এর ঐতিহাসিক তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগে বাধ্য হন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ (১২তম ও ১৪তম রাষ্ট্রপতি)
প্রথম মেয়াদ (অস্থায়ী): এরশাদের পতনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর সফল নির্বাচন দিয়ে পদ ছাড়েন।
দ্বিতীয় মেয়াদ: ১৯৯৬ সালে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরের পূর্ণ মেয়াদ পার করেন।
আব্দুর রহমান বিশ্বাস
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান আব্দুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর মেয়াদ শেষ করে তিনি বিদায় নেন।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েনে মাত্র ৭ মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।
মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার (ভারপ্রাপ্ত)
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলান তিনি।
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শপথ নেন তিনি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ২০০৬ সালে অতিরিক্ত হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্বও নেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সংঘাত ও জরুরি অবস্থা জারির পর প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়লেও ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।
মো. জিল্লুর রহমান
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতির পদে বসেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা মো. জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিংগাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।
মো. আবদুল হামিদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রপ্রধান মো. আবদুল হামিদ। ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ থেকে তিনি ভারপ্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ বছর দেশের রাষ্ট্রপতির আসন অলঙ্কৃত করেন।
মো. সাহাবুদ্দিন
আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।
বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ২০ আগস্ট ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এরই মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবে বাংলাদেশ।

