নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বক্তাদের উপস্থিতিতে শনিবার (২৯ আগস্ট) নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়াতে (এফসিসি) নির্ধারিত ইউরোপ-এশিয়া সম্পর্ক বিষয়ক একটি সেমিনার শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। ‘বিশেষ কিছু বিতর্কের’ কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা যাবে না—নয়াদিল্লি পুলিশের এমন হস্তক্ষেপর পর তা স্থগিত করা হয়।
ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রস্পারিটি’ শীর্ষক সেমিনারটি শনিবার সন্ধ্যায় বেলজিয়ামভিত্তিক ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ ও অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে মিলে আয়োজন করেছিল এফসিসি।
শনিবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে আয়োজকরা জানান, নয়াদিল্লি পুলিশের ‘অস্পষ্ট ও অপ্রত্যাশিত হস্তক্ষেপর’ কারণে ক্লাবটি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠানটি আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণের জন্য নির্ধারিত বক্তাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি, ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ এবং বাংলাদেশ-আমেরিকান বিজ্ঞানী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরোন্নবী। বক্তাদের তালিকায় চেক রাজনীতিবিদ ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য অনদ্রেজ দোস্তালও ছিলেন, যিনি শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব সিবি জর্জের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
যৌথ বিবৃতিতে এফসিসি সভাপতি ওয়ায়েল আউয়াদ এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন জানায়, “সিদ্ধান্তটি খুব অল্প সময়ের নোটিশে জানানো হয়েছে, যা আয়োজক এবং এফসিসি সাউথ এশিয়ার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “আয়োজকরা ইউরোপ-এশিয়া সম্পর্ক, শান্তি, সমৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক ইতিবাচক সংলাপ প্রসারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা উপযুক্ত কোনো ভবিষ্যতে অনুষ্ঠানটি আয়োজনের আশা করছি এবং যথাসময়ে বিস্তারিত জানাব।”
তবে দিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
নয়া দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) শচীন শর্মা ‘দ্য প্রিন্ট’কে জানান, এফসিসির কোনো প্যানেল আলোচনার জন্য পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তিনি বলেন, “তাদের কোনো কর্মসূচিতে আমরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করিনি।”
তবে ‘দ্য ওয়ার’-এর দেখা একটি নথিতে দেখা যায়, তিলক মার্গ থানা এফসিসি-কে সরাসরি জানিয়েছিল যে কর্মসূচিটির ‘অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না’।
তিলক মার্গ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (এসএইচও) লেখা এফসিসির ২৯ আগস্টের চিঠিতে জানানো হয়েছিল যে, ক্লাবটি হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একটি ‘সেমিনার-কম-প্রেস কনফারেন্স’-এর আয়োজন করছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের অনুরোধও করা হয়েছিল।
চিঠিটি একটি হাতে লেখা মন্তব্যসহ ফেরত পাঠানো হয়: “প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কিছু বিতর্কের কারণে এই কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া যাচ্ছে না মন্তব্যসহ ফেরত পাঠানো হলো।”
চিঠিটিতে তিলক মার্গ থানার সিলমোহর এবং এসএইচও-র স্বাক্ষর রয়েছে বলে মনে হয়।
এই হস্তক্ষেপকে বেশ অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ সেমিনারটিকে বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক কোনো অনুষ্ঠান হিসেবে প্রচার করা হয়নি। এফসিসির কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, এত অল্প সময়ের নোটিশে পুলিশ তাদের কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে—এমন অভিজ্ঞতা অতীতে তাঁদের নেই।
হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের মহাসচিব এ.এফ.এম. গোলাম জিলানী এই অনুষ্ঠানের অন্যতম বক্তা ছিলেন। তবে ভিসা না পাওয়ায় তিনি ভারতে আসতে পারেননি।
শনিবার রাতে ‘দ্য ওয়ার’-এর সঙ্গে আলাপকালে জিলানী জানান, তাঁর ভিসা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এই বিষয়টি তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। তিনি বলেন, “আমি মনে করি এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমি ভারতীয় প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ভিসা দেওয়ার আগে তাদের যাচাই-বাছাই করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।”
এফসিসির অনুষ্ঠানটি কেন বন্ধ করা হলো—সে বিষয়ে কিছু জানা নেই বলে জানান তিনি। “আপনি পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তারা সঠিক উত্তর দিতে পারবে। আমাদের কাছে আর কোনো তথ্য নেই,” বলেন জিলানী।
অনুষ্ঠান বাতিলের কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে—এমন ইঙ্গিত তিনি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, “এটি বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো বিষয় নয়। এটি ইউরোপ-এশিয়া সম্পর্ক নিয়ে।”
তাঁদের সংস্থা আওয়ামী লীগের পন্থী কি না জানতে চাইলে তিনি তা পুরোপুরি অস্বীকার করেন। জিলানী বলেন, “না, না। এটি ভুল ধারণা। তাঁদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।” তিনি তাঁর সংস্থাকে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “আমরা মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করি।”
তবে অতীতে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদের নিয়ে হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের কাজ করার কিছু নথিবদ্ধ ইতিহাস রয়েছে।
‘সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম’-এর ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে রোহিঙ্গা সংকট সংক্রান্ত একটি সম্মেলন ‘সোশ্যালিস্ট অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস গ্রুপ’, ‘বেলজিয়াম আওয়ামী লীগ’ এবং ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ যৌথভাবে আয়োজন করেছিল। সেখানে জিলানীকে ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
চলতি বছরের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগের ইউরোপীয় শাখা জানায়, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, মানবাধিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি বিষয়ক একটি সেমিনার হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল। সেখানে ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয় যে, জিলানী ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এতে অংশ নেন।
এফসিসিতে বাংলাদেশের পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রথম প্রচারমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনার চার সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই পুলিশি হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটল। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম কোনো গণমাধ্যম সংক্রান্ত তৎপরতা।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারত থেকে অডিও লিঙ্কের মাধ্যমে দিল্লিতে অবস্থিত এফসিসি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, যা তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনটিতে ঘটেছিল।
ঘটনাটি ঢাকায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ভারতের রাজধানীতে বসে হাসিনাকে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার “ক্ষুব্ধ” প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি জানায়, অনুষ্ঠানটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এবং বর্তমান সরকারের বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আয়োজনের পরিকল্পনাও কিছুটা জটিলতার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, নয়াদিল্লিতে হাসিনার উপস্থিতির ফলে তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরের পরিবেশ “কলুষিত” হয়েছে এবং এই সফরের জন্য একটি “অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।”

