কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বাইরে ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ধর্মীয় বিষয়সহ নানা ইস্যুতে রাজপথে একসঙ্গে থাকলেও সহসাই জোটবদ্ধ হওয়ার লক্ষণ মিলছে না। দলগুলোর একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এর আগে, গত ১৬ জুলাই সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে জোট গঠনের উদ্যোগ নেয় হেফাজত। মূলত জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে ইসলামপন্থিদের স্বতন্ত্র একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এর অংশ হিসেবে দলগুলোকে হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর কাছে ৩ আগস্টের মধ্যে জোট গঠনের প্রস্তাবনা জমা দিতে বলা হয়। অর্থাৎ, আজই এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা পাঠানোর শেষ দিন।
সাত দলের মধ্যে অন্তত দুটি দল সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রস্তাব জমা দেয়নি। দল দুটির একটি হচ্ছে বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে যাওয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। অন্যটি জামায়াতের জোট শরিক মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাত দল মিলে রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি বা বাস্তবতা এখনও তৈরি হয়নি। আর হেফাজতের উদ্যোগের কারণেই খেলাফত মজলিস বা বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জামায়াত জোট ছেড়েছে—বিষয়টি এমন নয়।
সাত দলের ঐক্য গঠনের জন্য জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল থেকে একেবারে বেরিয়ে যাওয়া জরুরি নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ এশিয়া পোস্টকে বলেছেন, কওমি দলগুলোর জোট জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যে প্রভাব ফেলবে না। আর জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত কারও সঙ্গে জোট গঠনে আপত্তির কথা জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
এদিকে হেফাজত আমিরের কাছে পাঠানো জোট গঠনের প্রস্তাবনায় ধর্মীয় ইস্যুর পাশাপাশি গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে একাধিক দল। সবার প্রস্তাব পাওয়ার পর একটি সমন্বিত খসড়া তৈরি করা হবে। হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি জসিম উদ্দিন এবং হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানসহ ছয়জন মিলে এটি প্রস্তুত করবেন।
দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতেও হেফাজতের সরব ভূমিকা দেখতে চায় তারা। হেফাজতও চায়, নানা মতপার্থক্য সত্ত্বেও কওমি ধারার দলগুলোকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসতে। সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদরীস এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলগুলোর কাছ থেকে আসা প্রস্তাব নিয়ে বুধবার (৫ আগস্ট) হেফাজতের বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে পর্যালোচনার পর আবারও তাদের সঙ্গে বসা হবে।’
হেফজত সক্রিয় রাজনীতি করে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ঐক্য তো বড় ব্যাপার। যখন হওয়ার কথা ছিল, তখন হয়নি। সামনে হবে, জোরালোভাবে এমন আশাও করতে পারছি না। তবুও আমরা চেষ্টা করছি।’
জমিয়তের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জরুল ইসলাম আফেন্দী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সাতটি দলের মধ্যে ঐক্য নিশ্চিত করতে চায় হেফাজত। স্থানীয় নির্বাচন বা আগামী দিনের পরিকল্পনা প্রণয়নে দলগুলোকে একসঙ্গে রাখতে চায় তারা। জমিয়ত দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে প্রস্তাবনা দেবে। ঐক্যটা ধর্মীয় নাকি রাজনৈতিক হবে—পুরোপুরি রূপরেখা সামনে না এলে বলা যাচ্ছে না।’
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল ছাড়ল খেলাফত মজলিস
নির্বাচনি ঐক্য কার সঙ্গে কে করবে, এটা তাদের নিজস্ব বিষয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ জনগণের অধিকার আদায়ে আমরা ১১ দলে আছি। এটা ধর্মীয় বা আদর্শিক ঐক্য নয়। আমরা নির্বাচনের আগে সমমনা ইসলামি ছয় দল নিয়ে একসঙ্গে কাজ করেছি। পরে একেকজন একেক জায়গায় গিয়েছে। সাত দলের কারণে অন্য কোনো দলে প্রভাব পড়বে না। অন্য জোটে থেকেও সাত দলীয় ঐক্য গড়া যায়।’
ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন রাজনৈতিক সংগঠন। আমরা ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা করে দেখি না। এটা কি রাজনৈতিক নাকি ধর্মীয় ঐক্য হবে, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। কোনো দল জামায়াত জোটে থাকবে, আবার সাত দলে থাকবে—এটা হবে না। ইসলামী আন্দোলন এমন কারও সঙ্গে আলাদা করে জোট করবে না, যারা দুই দিকেই আছে।’
